• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ০৭ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

উন্নয়নের গল্প শুনি, কিন্তু বিদ্যুতের গল্প কবে বদলাবে?


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শনিবার, ০১ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:১৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু দালান, বড় বড় প্রকল্প কিংবা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের আসল মানদণ্ড হলো—মানুষ কতটা স্বস্তিতে বাঁচছে, কতটা নির্ভরযোগ্য নাগরিক সেবা পাচ্ছে। আর সেই মৌলিক সেবাগুলোর অন্যতম হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।

আজ বগুড়াকে নিয়ে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখি। বিভাগ হওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন হয়েছে। মহানগরের মর্যাদা পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ এগোচ্ছে। পাঁচ তারকা হোটেল এসেছে, আরও আসবে। ইপিজেড প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে, সেটিকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা আছে। ফুটবল স্টেডিয়াম, ড্রোন নির্মাণ, আধুনিক শিল্পায়ন—সবকিছু নিয়েই আশার কথা শোনা যায়।.

এসবই অবশ্যই ইতিবাচক। উন্নয়ন হোক, আরও হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে শহরে মানুষ একটি রাতও নিশ্চিন্তে বিদ্যুৎ পায় না, সেই শহরের উন্নয়নের ভিত্তি কতটা শক্ত?.

বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক নাগরিক সেবা। আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু বিদ্যুৎ। অথচ বগুড়ার মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে—এর কোনো নির্ভরযোগ্য ধারণা নেই। কখনও এক ঘণ্টা, কখনও দুই ঘণ্টা, আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার কয়েক মিনিট পরই পুনরায় চলে যায়। এটি যদি নিয়মিত ঘটে, তবে একে শুধু "লোডশেডিং" বলে ব্যাখ্যা করলেই দায় শেষ হয় না।.

লোডশেডিং সাধারণত চাহিদা ও উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী হয়। কিন্তু অনিয়মিত, ঘন ঘন ও পূর্বঘোষণা ছাড়া বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া নাগরিক জীবনে ভোগান্তি তৈরি করে। ফলে মানুষের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এটি কি কেবল লোডশেডিং, নাকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি?.

বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু একটি বাতি নিভে যায় না। থেমে যায় শিশুর পড়াশোনা। অসুস্থ মানুষের কষ্ট বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়। ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ ব্যাহত হয়। ছোট উদ্যোক্তাদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। গরমে বৃদ্ধ, শিশু ও রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর অন্তত রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে চান। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট সেই সামান্য স্বস্তিটুকুও কেড়ে নেয়।.

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উন্নয়নের অসংখ্য প্রচার দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবে মানুষ বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করে। উন্নয়নের প্রচার তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়। কারণ উন্নয়নের সফলতা পোস্টারে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়।.

অনেকেই বিকল্প হিসেবে ইনভার্টার, জেনারেটর বা সোলার ব্যবস্থার কথা বলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব কি সবার নাগালের মধ্যে? একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সীমিত আয়ের চাকরিজীবী কি সহজেই এই ব্যয় বহন করতে পারেন? বাস্তবতা বলছে, পারেন না। তাই বিদ্যুতের সমস্যার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন সাধারণ মানুষই।.

বগুড়ার মানুষ নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। তাহলে তারা কেন নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন না? কেন প্রতিদিন একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে? উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনার পাশাপাশি এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকা উচিত।.

বড় প্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি আধুনিক শহরের পরিচয় কেবল বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় বা পাঁচ তারকা হোটেলে সীমাবদ্ধ নয়। একটি আধুনিক শহরের পরিচয় তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন সাধারণ মানুষ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন—"আজ রাতে অন্তত বিদ্যুৎ থাকবে।".

বগুড়ার মানুষ উন্নয়নের বিরোধী নয়; বরং উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সমর্থক। কিন্তু তারা চান উন্নয়ন হোক বাস্তবমুখী, মানুষের জীবনকেন্দ্রিক। এমন উন্নয়ন, যা শুধু সংবাদ শিরোনামে নয়, মানুষের ঘরেও আলো জ্বালাবে।.

কারণ একটি শহরের সত্যিকারের উন্নয়ন তখনই হয়, যখন উন্নয়নের আলো প্রকল্পের ফাইল থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।. .

Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ (সামসিল আরিফিন)

সম্পাদকীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ